বিবাহিত জীবনে ১০ বছরের মধ্যে ছয়বার বাসা বদল করে ফেলেছেন মিলি। স্বামী সরকারি চাকরিজীবী। এ জন্যই তাদের কয়েক বছর পর পর বাসা বদল করতে হয়েছে। বাসা বদল মানে শুধু যে জিনিসপত্র এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বদল তা নয়, পুরো সংসার নতুন করে পাততে হয়। তাই বাসা বদলের কথা শুনলেই বাড়ির গিনি্নদের মাথায় যেন বাজ পড়ে। অনেকেই আবার অগি্নশর্মা হয়ে যান। প্রথমেই রাগ না করে ব্যাপারগুলো বোঝার চেষ্টা করতে হবে। স্বামী-স্ত্রী দু’জনের ভেতর পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে কঠিন কাজও সহজেই সম্পন্ন করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে বাসা বদলও ব্যতিক্রম কিছু নয়।

প্রথমেই দেখতে হবে বদলি কোথায় হয়েছেন, সেখানে যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা আছে কি-না, অফিসে থাকার বন্দোবস্ত আছে কি-না অথবা কত দিনের জন্য সেখানে যাওয়া হচ্ছে। যদি আপনি চাকরিতে নতুন হন, তবে স্বামীর পোস্টিংয়ের জায়গায় চাকরির জন্য দরখাস্ত করতে থাকুন। কিংবা সেখানে আপনার উপযুক্ত অন্য কোনো নতুন চাকরি খুঁজতে চাইলে ইন্টারনেটের সাহায্যে খুব সহজেই খুঁজে দেখতে পারেন। এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সি থেকেও সাহায্য পেতে পারেন। সমস্যা প্রকট হয় যদি সামনেই আপনার কোনো প্রমোশনের সুযোগ থাকে। এ ক্ষেত্রে আপনার স্বামীর ট্রান্সফার কিছুদিনের জন্য স্থগিত করার আবেদন করে দেখতে পারেন। যদি তা না হয়, শেষ পর্যন্ত একটা সিদ্ধান্তে আপনাদের আসতেই হবে। কিছুদিন একা থেকে প্রমোশনটা নিয়ে নিন। প্রমোশন না নিলে তা আপনাকে বিষণ্নতায় ভোগাতে পারে, যা পরবর্তীকালে আপনাদের সংসার জীবনেও সৃষ্টি করতে পারে মনোমালিন্য। তাই এসব ব্যাপারে প্রথম থেকেই সাবধানতা অবলম্বন করুন।

বদলি যেখানেই হোক না কেন, চেষ্টা করতে হবে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ কাউকে সঙ্গে নিতে। কারণ, তাদের পরামর্শ নতুন জায়গায় কাজে লাগে অনেক ক্ষেত্রেই। নতুন জায়গায় আপনি আপনার সন্তানকে একা বাসায় রেখে যেতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারেন। সে ক্ষেত্রে বাসার বড় কেউ থাকলে আপনি স্বস্তিমতো কাজে যেতে পারবেন।

এখন আসা যাক ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপারে। ছেলেমেয়েরা বড় ক্লাসে থাকলে টার্মের মাঝখানে জায়গা বদলিতে পড়াশোনায় ক্ষতি হতে পারে। আবার হঠাৎ করে জায়গা বদলির ফলে তাদের নতুন জায়গায় নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার একটা বিষয় তো রয়েছেই। ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে স্কুল বদল বা নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বিষয়টি কিছুটা সহজ। কিন্ডারগার্টেনগুলোতে যে কোনো সময় ভর্তি হওয়ার সুযোগ থাকে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন কোনোভাবেই ইয়ার লস না হয়। যদি একান্তই বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়া সম্ভব না হয়, তবে বিশ্বস্ত কারও কাছে রেখে যেতে হবে। দাদা, দাদি, নানা, নানি, চাচা, মামারা সহযোগিতা করতে পারে।
যদি হোস্টেলে বাচ্চাদের রাখতে হয়, তবে সব সময় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। তারা যেন কখনই নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে। তাদের সঙ্গে বসেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাদের বুঝতে দিতে হবে, তাদের ছাড়া আপনাদেরও কষ্ট হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে তাদের যেন মানসিক কোনো চাপ বা পড়াশোনায় যেন ক্ষতি না হয়। প্রতি মাসে শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপচারিতার মাধ্যমে জেনে নিতে পারেন তাদের অবস্থা। তা ছাড়া তারা কোথায়, কখন যাচ্ছে তার খোঁজখবর রাখা উচিত। তাদের থেকে দূরে থাকলেও বোঝাতে হবে আপনারা সব সময় তাদের সঙ্গেই আছেন।

বাসা বদলানোর এক মাস আগে থেকে কিছু কিছু করে প্রস্তুতি নিতে হবে। তাহলে হঠাৎ করে কাজের ঝামেলা হবে না।
ডিশ, ইন্টারনেট ও ফোন বাসা বদলানোর প্রায় এক সপ্তাহ আগেই আপনার স্যাটেলাইট, ইন্টারনেট ও ল্যান্ডফোনের অফিসে যোগাযোগ করে নতুন ঠিকানা জানিয়ে দিন। তাহলে নতুন বাসায় গিয়ে ডিশ, ইন্টারনেট বা ফোনের সংযোগ পেতে অযথা ভোগান্তিতে পড়তে হবে না।

ভ্যান-পিকআপ-ট্রাক ভাড়া : বাসার জিনিসের পরিমাণ অনুমান করে আগেই কোনো বিশ্বস্ত জায়গা থেকে ভ্যান বা পিকআপ ভাড়া করে রাখুন। না হলে শেষ মুহূর্তে ভ্যান পেতে সমস্যা হতে পারে। বাসা দূরে বা এক শহর থেকে অন্য শহরে বাসা বদলালে ট্রাক ভাড়া করে নিলেই সুবিধা। ভ্যান, পিকআপ ভ্যান কিংবা ট্রাক_ যেটাই ভাড়া করে থাকেন, আগে থেকে তাদের বাসা বদলানোর সময় ও বর্তমান বাসার ঠিকানা জানিয়ে দেবেন। বাসা বদলানোর আগের দিন রাতে ফোন দেবেন, ঠিক সময় যেন এসে পড়ে।

নতুন বাসা পরিষ্কার : নতুন বাসায় ওঠার আগেই দরজা-জানালার পর্দার মাপ নিয়ে পর্দা সেলাই করিয়ে ফেলতে হবে। বাসায় ধুলাবালি থাকলে জিনিসপত্র নেওয়ার আগে সেগুলো পরিষ্কার করিয়ে নিন। রঙ করার প্রয়োজন হলে বাড়ির মালিককে আগেই জানিয়ে দিন।

প্যাক করুন : আগে থেকে বাক্স বা কার্টনের ব্যবস্থা করতে হবে জিনিসপত্র গোছানোর জন্য। বাক্সের গায়ে লেভেল করা যেতে পারে। এতে সহজেই চেনা যাবে কোন বাক্সে কী আছে। আগে থেকে ঠিক করে রাখলে ভালো হয় কোন বাক্স কোন ঘরে যাবে। যেসব জিনিস খুব সহজে ভেঙে যেতে পারে, তা আলাদাভাবে প্যাক করতে হবে। দামি শোপিস বা ফুলদানি তোয়ালে দিয়ে পেঁচিয়ে মুড়ে নিলে ভালো হয়। হাতের কাছে খবরের কাগজ, টিস্যু, টেপ রাখলে ভালো হয়। এতে প্যাকেট করতে সুবিধা হবে। মূল্যবান গয়না, টাকা কিংবা দলিল নিজের হাতব্যাগে রাখতে হবে। এগুলো অন্য মালপত্রের সঙ্গে দিলে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। ওষুধপথ্য আগে থেকে আলাদা করে রাখা ভালো।

রান্নাঘর সামলে নিন : বাসা বদলানোর এক সপ্তাহ আগে থেকেই ধীরে ধীরে ফ্রিজ খালি করা শুরু করুন। ফ্রিজের কাঁচাবাজারগুলো রান্না করে ফেলুন। সহজে নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো খাবারগুলো খেয়ে ফেলুন আগেই। বাসা বদলানোর আগের দিন একবারে বেশি করে রান্না করে ফেলতে হবে। যেদিন বাসা বদলাবেন, সেদিন রান্নাবান্না করার সময় পাওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে এমন খাবার বানিয়ে নিন, যেগুলো বেশিক্ষণ ভালো থাকে এবং নতুন বাসায় গরম করে খেতে সুবিধা হবে। বাসা বদলানোর আগের দিন খাওয়ার পানিও ফুটিয়ে নিন বেশি করে। কারণ, নতুন বাসায় গিয়ে চুলা লাগাতে কিছু সময় লাগতে পারে।

বাসা বদলানোর দিন : নতুন বাসায় জিনিসপত্র তোলার সময় বলে দিন কোন জিনিস কোন রুমে যাবে। এভাবে একবারেই আসবাবপত্রগুলো জায়গামতো বসিয়ে নিলে ঝামেলা কমে যাবে। এবার ধীরে ধীরে সাজিয়ে-গুছিয়ে নিন আপনার নতুন বাসা।

সবকিছু মিলিয়ে প্রথম থেকেই সব প্রস্তুতি শেষ করে ফেলতে হবে যেন শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়া করতে না হয়।

সংগৃহীত : শৈলী (সমকাল)